ঈশ্বরের অস্তিত্ব, ও আমার উপর তার প্রভাব।

দুনিয়ার প্রধান ধর্ম, যেগুলো সভ্য মানুষেরা মেনে চলে তাদের মধ্যে বিস্তর প্রভেদ। দুটো তিনটে আলাদা বক্তব্য একই সঙ্গে সত্যি হতে পারেনা, কিনতু একই সঙ্গে সবগুলি মিথ্যা হতেই পারে। কাজেই ফারাক গুলো আপাততঃ দূরে থাক। যেগুলো মোটামুটি সব ধর্মেই এক রকম বলা হয় সেইগুলো আগে দেখা যাক।

১) জগতের একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন—
এই কথাটা সব প্রধান ধর্মেই আছে। এই সৃষ্টিকর্তাকেই তারা ভক্তি করে থাকে। কিন্তু ধর্মগুলোই বলে যে তাঁর অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না। বিশ্বাস করে নিতে হবে যে তিনি আছেন। যেহেতু জগতের সৃষ্টিকর্তা ছাড়া জগৎ তৈরী হতে পারে কিনা তা বিতর্কিত কাজেই আপাততঃ এগোনোর জন্য ধরা গেল যে জগৎ কেউ একজন বানিয়েছিলেন কয়েকশ কোটি বছর আগে। কিন্তু তিনি যে মাত্র একজন, একাধিক ঈশ্বর নন তারও কোনো যুক্তিপ্রমাণ নেই। তবে যেহেতু তিনি বলেছেন যে তিনি একজন, সেটাও আপাততঃ মেনে নিয়ে এগোনো যাক।

২)সেই সৃষ্টিকর্তা এখনো আছেন এবং তাঁর সৃষ্টির উপর লক্ষ্য রাখছেন—
জগৎ যখন পরিকল্পনা মাফিক বানানো তখন সেই ঈশ্বরের চেতনা অবশ্যই ছিল। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় চেতনাযুক্ত কোনো কিছুই কয়েক কোটি বছরও টেঁকে না। পিরামিড, তাজমহল, চীনের প্রাচীর যারা সৃষ্টি করেছিল তারা কেউ আজ নেই। কাজেই ঈশ্বর নামক এই চেতনাটি একটি ব্যাতিক্রম। কিন্তু ব্যাতিক্রম কেউ বিনা প্রশ্নে মেনে নেবে এটা স্বাভাবিক নয়। জর্জ ওয়াশিংটনকে আমরা কেউ দেখিনি, কিন্তু তিনি যে দুই-পায়ে চলাফেরা করতেন এটা বিনা প্রশ্নে সকলে মেনে নিতে পারে। কিন্তু যদি বলা হয় তিনি ক্যাঙ্গারূর মত লাফাতেন, সেটা কেউ বিনা প্রমানে মানবে না। (কারন এরকম ঘটনা ঘটে না।) বিশ্বাসীদের দ্বিতীয় দাবী “সবার চেয়ে বুড়া সেই ঈশ্বর আজো টিকে আছেন” এর পিছনেও কোনো প্রমাণ নেই। তবুও মেনে নিতে হবে।

৩) ঈশ্বর মানুষকেই সেরা জীব হিসাবে বানিয়েছেন—
এই কথাটা কেবল যে মানুষে বিশ্বাস করে তার কোনো প্রমাণ নেই। রাস্তার নেড়িকুত্তাও হয়তো বিশ্বাস করে যে সেই এই দুনিয়ার সেরা জীব। মানুষ নামের কয়েকটা বাজে চোরা টাইপের জন্তু ঈব্লিশের কাছে পরামর্শ নিয়ে তার সব সম্বল কেড়ে নিয়ে তাকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। সাদা চামড়ার মানুষেরা অনেকেই আফ্রিকার লোকেদের চেয়ে নিজেদের বড় ভাবত, এখনো ভাবে। অন্যদিকে এস্কিমোরা তাদের অলস লোকেদের ঠাট্টা করে “সাদা-দের মত অলস” বলে। বাস্তবে মানুষ নামের জন্তুটির বদগুণ এতই যে গুনে শেষ করা যায় না। আর মানুষের শেখার ক্ষমতার কথা তুললে ত কুত্তা, বিল্লি, গোরু, ছাগল এরা হেসেই মারা যাবে। তারা মানুষের ভাষা বোঝে কিন্তু মানুষ তাদের কথা বোঝার ক্ষমতা রাখে না। মানুষ যে আজ পৃথিবীর উপর রাজত্ব করে তার একমাত্র কারণ হল তার হাতে এমন সব অস্ত্র আছে যা অন্য জন্তুরা হাতে পায় না।

৪) যেহেতু মানুষকে ঈশ্বর বানিয়েছেন, কাজেই মানুষের কখনই ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করা উচিৎ নয়—
এই দাবীটিও একটি ব্যতিক্রম। যারা বন্দুক পিস্তল বানায় কিম্বা মোটর-গাড়ী, যুদ্ধবিমান বানায় সেগুলো কি সেই কারিগরদের ইচ্ছায় চলে? তাছাড়া মানুষের মধ্যে যখন বিচারের ক্ষমতা আছে সে অন্যের নির্দেশে চলবে কেন? তাহলে যন্ত্র বানালেই ত পারতেন সেই মহান ঈশ্বর। কোনোখানেই কখনোই এইরকম ঘটনা ঘটে না। একমাত্র ঈশ্বরের বেলাতেই আলাদা নিয়ম। ঈশ্বর বলেই কিনা কে জানে...

৫) ঈশ্বর মানুষের মঙ্গল চান, কাজেই তাঁর নির্দেশ মানুষের মানা উচিৎ--
এই কথাটার একটা মানে হয়। যে আমার ভালো চায় তার কথা নিশ্চয় মেনে চলা উচিৎ। কিন্তু ভালো যে চান সেইটা ত আগে প্রমাণ হওয়া চাই। বিশ্বাস অবশ্য করা যায়, কিন্তু প্রমাণ করা যায় কি? এই দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি মানুষ মরে ধর্মের আর ঈশ্বরের নামে। মানুষের ভাল চাইলে নিশ্চয় তিনি এগুলো বন্ধ করার জন্য কিছু করতেন। আর যদি তিনি মানুষের ভালোর দায় মানুষেরই ঘাড়ে দিতে চান তাহলে আর তাঁর কথায় চলার দরকার কি? নিজের বুদ্ধিতে চললেই ত হয়।

৬) ঈশ্বর আমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী, কাজেই তাঁর আদেশ আমাদের মেনে নেওয়া উচিৎ--
ঈশ্বর কেমনতরো জ্ঞানী সেটা নিয়ে কোনো কথাই বলা মুশকিল। তবে একটা কথা পরিষ্কার, ঈশ্বর যখন জ্ঞানের কথা বলেন তা কারুর মাথাতেই ঢোকে না। আর্‍যভট্ট যখন বলেছিলেন যে পৃথিবী ঘুরপাক খায় বলেই দিন-রাত হয় সেটা সবাই বুঝেছিল। যারা বিশ্বাস করেনাই তাদেরো কথাটা বুঝতে পারায় অসুবিধা হয়নি। কিন্তু এই কথাটা ঈশ্বর যদি বলেও থাকেন (আজকাল অনেকে এমন দাবী করেন) সে কথা অতি বড় ভক্ত থেকে অতি বড় জ্ঞানী কারুর মাথাতেই ঢোকেনি। কাজেই যে কথাটা কেউ বুঝল না সে জ্ঞান যে না দেওয়ার সমান, এই জ্ঞান টুকু ঈশ্বরের নেই বলেই ধরা যেতে পারে। আর এখন তো বিশ্বাসীর সংখ্যা আরো কম। তাই ঈশ্বরের দেওয়া জ্ঞান মাথায় ঢোকানোর আশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পথ খোঁজাই ভাল।

৭) মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ তার ভুল হয়। কাজেই ঈশ্বরের আদেশ নিয়ে তর্ক করা উচিৎ না—
ন্যায়শাস্ত্রে ‘আপ্তবাক্য’ বলে এক ধরনের প্রমান আছে, যার অর্থ যিনি জানেন। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় তদন্তকারী অফিসারের দেওয়া রিপোর্ট প্রমাণ হিসাবে ধরা হয়, কারণ তিনি নিজে দেখে বলছেন। এবার দেখা যাক কোন কোন কথাকে আপ্তবাক্য ধরা যেতে পারেঃ-

অন্য ব্যক্তির কথা অনেক ক্ষেত্রেই প্রমাণ হিসাবে ধরা হয়ে থাকে। কিন্তু শর্ত হিসাবে ব্যক্তিটিকে বিশ্বাসযোগ্য এবং নিরপেক্ষ হতে হবে। যে মিথ্যা বা ভুল বলতে পারে বলে জানা গেছে তার কথা অন্য আরো প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত না হলে নিশ্চিত ধরা হবে না। চাণক্যের উপদেশে বলা আছে যে এক গুপ্তচর ভুল করতে পারে, বা শত্রুর টাকা খেয়ে মিথ্যা খবর দিতে পারে। তাই রাজার উচিৎ একই খবর জানার জন্য একাধিক চর পাঠানো। একাধিক ব্যক্তি যদি আলাদা ভাবে একই কথা বলে তাহলে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে। ধর্মগুলোর ক্ষেত্রে এই বিশ্বাসযোগ্যতা পাওয়া যায় না। যতজন ধর্মগুরু ঈশ্বরের বানী আমাদের শুনিয়েছেন প্রত্যেকের মধ্যে বিস্তর ফারাক। কাজেই নতুন করে আবার গবেষণা না করে তাঁদের কারোর কথাই প্রমাণ হিসাবে মেনে নেওয়া যায় না। যেহেতু মানুষ মাত্রেরই ভুল হতে পারে কাজেই তাঁদেরও ভুল হওয়া অসম্ভব নয়।

আপ্তবাক্য কখনোই প্রত্যক্ষ বা যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ এর চেয়ে বড় হতে পারে না। সোজা কথায়, আপ্তবাক্য যদি প্রত্যক্ষ প্রমাণ বা যুক্তিসঙ্গত অনুমান এর বিরোধী হয় অথবা অন্য কোনো আপ্তবাক্যের বিরোধী হয় সেক্ষেত্রে নতুন করে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ন্যায়শাস্ত্রের এই প্রাথমিক শর্তটুকু কোন ধর্মই মানতে রাজি নয় বলেই ধর্ম এবং তার ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস রাখা যায় না। তাদের নির্দেশে মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রন করাও যায় না।

ধর্মগ্রন্থগুলি এক ধরনের আপ্তবাক্য। যাঁরা এগুলি দিয়েছেন তাঁরা বলেন এগুলি ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া। সেই সঙ্গে তাঁরা স্বীকার করেই নিয়েছেন যে এগুলি প্রত্যক্ষ বা যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ এর বিরুদ্ধে। (তবুও বিশ্বাস করতে হবে।) এখন এই নির্দেশগুলি যদি এমন কারো কাছ থেকে এসে থাকে যিনি কখনো ভুল করেন না বা জেনেশুনে মিথ্যা বলেন না তাহলে অবশ্যই বিশ্বাস করার মত। কিন্তু তার আগে প্রমাণ হওয়া দরকার যেঃ-

১) গ্রন্থটি বাস্তবিক ঈশ্বরের কাছ থেকেই এসেছে, এই ব্যাপারে ধর্মগুরু-র কোনো ভুল হয়নি।
২) ঈশ্বর সমস্ত কিছু জানেন, কখনোই ভুল করতে পারেন না।
৩) ঈশ্বর মানুষ জাতি কে নিজের দলে টানতে জেনেশুনে মিথ্যা বলছেন না।

“ঈশ্বর এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন” এটা ধরে নিলেও এই তিনটি কথা প্রমাণ না হওয়া পর্‍যন্ত কোনো ধর্মগ্রন্থের কথাই চোখ বুজে মেনে চলা কোনো যুক্তিবাদীর পক্ষে সম্ভব নয়। ঈশ্বরের অস্তিত্ব হয়তো একদা ছিল, কিম্বা এখনো আছে। কিন্তু আফ্রিকায় বাঘ থাকা বা না থাকার যেমন আমার উপর কোনো প্রভাব নেই তেমনি ঈশ্বরের থাকা না থাকারও আমার উপর কোনো প্রভাব নেই।

0 comments:

Post a Comment